বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১০:১২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

নতুন শিক্ষাক্রম: ভোটপ্রার্থীর প্রতিশ্রুতির মতো যেন না হয়

মাছুম বিল্লাহ : বাংলায় একটি প্রবাদ আছে ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কারিকুলাম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা যায় এটি শিক্ষাব্যবস্থার দিক নির্দেশনা। সেটি হতে হয় যুগোপযোগী। এটি হঠাৎ করার কোনো বিষয় নয়, আমূল বদলে ফেলারও বিষয় নয়। তবে প্রণীত কারিকুলাম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়। কারিকুলামের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে বই-পুস্তক তৈরি করা হয় সেখানে কিছু পাঠ পরিবর্তন করা, কিছু সংযোজন করা, পরিমার্জন করা, সেগুলোর মেসেজ ডিসেমিন্টে করা, মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়। এগুলো সবই স্বাভাবিক এবং অবিরত প্রক্রিয়া।

কিন্তু নতুন কারিকুলামে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; বিষয়টি এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যে, যেসব বিষয় কারিকুলামে আসছে সেগুলোর সঙ্গে বুঝি চলতি কারিকুলামের কোনো মিল নেই এবং এটি আর জীবনেও পরিবর্তন করার প্রয়োজন হবে না। এখানেই আমার ভয়!

আমাদের প্রাথমিকে কারিকুলাম বেশ একটি দীর্ঘ সময় ‘দক্ষতাভিত্তিক’ ছিল, এখনও তাই আছে। বিষয়ভিত্তিক কিংবা সার্বিক যে দক্ষতা তাদের অর্জন করার কথা, দেখা গেছে তার অর্ধেক, কোনো কোনো বিষয়ে তারও কম দক্ষতা অর্জন করছে পঞ্চম পাস করা একজন শিক্ষার্থী। মাধ্যমিকের কারিকুলাম ‘আউটকাম বেইজড’। দেখা গেল প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের কাঙ্খিত দক্ষতা অর্জিত হচ্ছে না। মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের যে আউটকামে পৌঁছানোর কথা তার ধারে কাছে নেই অনেকেই। শুধু গ্রেড পাচ্ছে, আর পাসের হার বাড়ছে। অতএব, মহা উৎসাহে আমদানী করা হলো তথাকথিত সৃজনশীল প্রশ্ন। প্রচার করা হলো- এবার শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি উল্টে যাবে, বদলে যাবে প্রাচীন ধারণা। দেখা গেল সৃজনশীল প্রশ্ন পুরনো ধাঁচের প্রশ্নের কাছে ধরা খেয়ে তার কাছে মিশে গেছে। হয়েছে এক মহা হ-য-ব-র-ল। তার আগে প্রশ্নব্যাংক আর মাল্টিপল চয়েস কোয়েশ্চেন দিয়ে যে হ-য-ব-র-ল করা হয়েছিল তার খেসারত কিন্তু শিক্ষার্থীরা এখনও দিচ্ছে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় তার রেশ এখনও কাটেনি। সেটি কাটতে আরও সময় লাগবে।

২০১৯ সাল থেকে শুনে আসছি আমাদের কারিকুলামে বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু কী হতে যাচ্ছে আসলে? প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়েই ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে শিখনকালীন মূল্যায়ণ হবে ৬০ শতাংশ, ৪০ শতাংশ মূল্যায়ন হবে ক্লাস শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে। যষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণিতে বিদ্যালয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে ৬০ শতাংশ, সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে ৪০ শতাংশ। নবম দশম শ্রেণিতে কয়েকটি বিষয়ে শিখনকালে অর্ধেক মূল্যায়ন এবং বাকি অর্ধেক সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে।

মনে রাখতে হবে প্রকৃত মুল্যায়নই হচ্ছে ‘ধারাবাহিক মূল্যায়ন’। কারণ সামষ্টিক মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের সকল দিক সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। এটি জানা সত্ত্বেও বহু দেশে সামষ্টিক মূল্যায়নই চলছে বহু বাস্তব কারণে। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ধারাবাহিক মূল্যায়নের কথা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই জানেন এবং এটি করতেও চান কিন্তু করা হচ্ছে না বা যাচ্ছে না। কারণ বহুবিধ। এখানে পদ্ধতি, পদ্ধতির সাথে শিক্ষকের মোটিভেশন, দক্ষতা আর প্রশাসনিক বিষয় জড়িত। শুধু যদি প্রচার করি বা কথায় কথায় বলি যে, ৬০ শতাংশ হবে ধারাবাহিক মূল্যায়ন। সেটি হবে স্কুল বেজইড অ্যাসেসমেন্ট (এসবিএ)। এসবিএ-র করুণ পরিণতির কথা আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি।

এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি, যে কোনো নতুন পদ্ধতি চালু করার পর বিশাল অংশের এক শ্রেণির শিক্ষক রপ্ত করতে পারেন না। আমাদের মনে আছে ইংরেজিতে কমিউনিকেটিভ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে সেই প্রায় ১৯৯৮-৯৯ সালে। সেটি কিন্তু স্বপ্নই রয়ে গেছে। যে উদ্দেশে এটি চালু করা হয়েছে তার ধারেকাছেও নেই শিক্ষার্থীরা। বরং তারা খুইয়েছে গ্রামারের দক্ষতা আর ফ্লুয়েন্সি। ইতোমধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের ৬২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষাক্রমের পাইলটিং চলছে। পাইলটিং কার্যকলাপ কী রকম চলছে, কী অভিজ্ঞতা অর্জিত হচ্ছে, কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে এগুলো বেশি বেশি আলোচনায় আসা উচিত। জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত। তারপর যৌথ সিদ্ধান্ত হবে কীভাবে ধীরে ধীরে কোথায় কীভাবে পরিবর্তন আনা হবে। আমাদের শিক্ষার্থীদের অবস্থা, শিক্ষকদের অবস্থা, শ্রেণিকক্ষ- এগুলোর মধ্যে কোথায় এত বড় বিপ্লব ঘটাবো? দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপকরণ, ম্যানেজিং কমিটি, দক্ষ শিক্ষক সংকটের কথা কারুরই অজানা নয়। আমরা কি সেদিকে এক বারও লক্ষ্য করেছি?

দীর্ঘদিন থেকে সবাই বলার চেষ্টা করছেন, আমাদের শিক্ষায় আনন্দ নেই, শিক্ষার্থীরা আনন্দ পাচ্ছে না, পড়াশোনা তাদের কাছের পাহাড়ের মতো। এখন লাখ টাকার প্রশ্ন হলো- শ্রেণিকক্ষে আনন্দটা দেবে কে এবং কীভাবে? কারিকুলাম তৈরি করে দিলেই শিক্ষার্থীদের আনন্দ নিশ্চিত হবে? বলা হচ্ছে, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে সরে এসে অভিজ্ঞতানির্ভর শিক্ষায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিক শিখন নিশ্চিত করা হচ্ছে। পরীক্ষার বিষয় ও পাঠ্যপুস্তকের চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যাতে নিজেদের মতো কিছুটা সময় কাটাতে পারে তা নিশ্চিত করতেই নতুন কারিকুলাম। পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা থাকছে না। এটি আমাদের মূল শিক্ষানীতিতেও নেই। হঠাৎ এসে জুড়ে বসেছিল। অধিকাংশ লোক পছন্দ করেনি। উপরোক্ত কথাগুলো সবই পজিটিভ, সবই আনন্দের সংবাদের মতো মনে হয়। যেসব জায়গায় শিক্ষার্থীদের সমস্যা ছিল, সব জায়গাতেই যেন বলা হচ্ছে- কোনো সমস্যা থাকবে না, সব দূর করা হবে, সব সমাধান করা হবে, যেমনটি নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগে একজন প্রার্থী বলেন। তারপর সমাধান কতটা হয় তাতো আমরা জানি।

যে কোনো পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য, নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের জন্য, শিক্ষার্থীদের অভ্যস্ত করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষকদের নিজেদের উৎসাহ, প্রয়োজন তাদের সেলফ মোটিভেশন, প্রশিক্ষণ দিয়ে এসব জায়গায় বড় পরিবর্তন আনা খুব কঠিন। শোনা যাচ্ছে মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করা হবে প্রতিটি উপজেলায়, তারা প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন অন্যান্য শিক্ষকদের। তারপর তারা নতুন পদ্ধতির সাথে পরিচিত হবেন। এটি করতে গেলে অজানা থেকে যাবে নতুন পদ্ধতি, যেমনটি হয়েছে সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রে, কমিউনিকেটিভ ইংরেজির ক্ষেত্রে, মাল্টিপল চয়েস প্রশ্নের ক্ষেত্রে, স্কুল বেইজড অ্যাসেসমেন্টের ক্ষেত্রে।

সুতরাং সব শেষে যেটি বলতে চাচ্ছি, অতি বেশি উৎসাহ না দেখিয়ে, বড় আকারে শোডাউনের জন্য হাঁকডাক না-করে পূর্বের অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে শুধু কাজ করাটাই বোধ হয় ভালো। কাজই দিন শেষে ফল বয়ে আনে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.


ফেসবুকে আমরা