রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ০১:৪০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ঘোষণা :

তামাক সেবনে দেশে ১২ লাখ মানুষ প্রাণঘাতি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট : দেশের প্রতি বছর তামাকজাতদ্রব্য সেবনের কারণে ফুসফুসে-মুখগহ্বরের ক্যানসার, হৃদরোগ ও হাঁপানিসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতি রোগে ১২ লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হৃদরোগের কারণে মৃত্যুর ৩০ শতাংশ, ক্যানসারে মৃত্যুর ৩৮ শতাংশ, যক্ষ্মায় মৃত্যুর ৩৫ শতাংশ এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগের মৃত্যুর হার ২০ শতাংশের জন্য ধূমপান দায়ী। এমনকি তামাক সেবনের কারণে দেশে প্রতিবছর ১ লাখ ২৬ হাজারের অধিক মানুষ মারা যায়। তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির (চিকিৎসা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হারানো) পরিমাণ বছরে ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। বাংলাদেশে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠির মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৪৮ শতাংশ, যেখানে অতি উচ্চবিত্ত জনগোষ্ঠির মধ্যে এই হার মাত্র ২৪ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক ছাড়ার সুফল অনেক। যদি কোনো ব্যক্তি টানা ১ বছর তামাকমুক্ত থাকতে পারেন তবে, তার হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ধূমপায়ীর তুলনায় অর্ধেক কমে যায় এবং ধূমপান ছাড়ার ১০ বছরের মধ্যে ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি অর্ধেকে নেমে আসে। এছাড়া ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে তামাক ছাড়লে প্রত্যাশিত আয়ু তামাক ব্যবহারকারীর তুলনায় প্রায় ১০ বছর বেড়ে যায়।
তারা আরও বলছেন, শ্বাসতন্ত্র এবং হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। তামাক ব্যবহারে করোনারি হার্ট ডিজিজ এবং স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি ২ থেকে ৪ গুণ বেড়ে যায় এবং মুখ গহ্বর, ফুসফুস, খাদ্যনালিসহ প্রায় ২০ ধরনের ক্যানসার হয়। অধূমপায়ীর তুলনায় ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে ২৫ গুণ। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুস সংক্রমণে (সিওপিডি) ধূমপায়ীদের মৃত্যুঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় ১৩ গুণ পর্যন্ত বেশি।
সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারিতে ধূমপায়ীদের গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি ৪০–৫০ শতাংশ বেশি বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রসহ পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ৩ কোটি ৮৪ লাখ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে। বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে ৪ কোটি ৮ লাখ মানুষ এবং এক্ষেত্রে নারীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় ঢাকার প্রাথমিক স্কুলে পড়া ৯৫ শতাংশ শিশুর শরীরে উচ্চমাত্রার নিকোটিন পাওয়া গেছে, এর মূল কারণ পরোক্ষ ধূমপান।

গ্যাটস ফলাফলে আরও দেখা গেছে, ২০০৯ সালের তুলনায় একজন বিড়ি সেবনকারীর বিড়ি বাবদ মাসিক খরচ বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে সিগারেট কিনতে একজন ধূমপায়ীর গড় মাসিক ব্যয় হয় ১০৭৭ দশমিক ৭ টাকা। অথচ শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য একটি পরিবারের মাসিক গড় ব্যয় যথাক্রমে মাত্র ৮৩৫ দশমিক ৭ টাকা। তামাকের জন্য ব্যয়িত অর্থ শিক্ষা ও চিকিৎসা দারিদ্র্য তথা মানবদারিদ্র্য মোকাবিলায় ব্যয় করা গেলে পরিবারগুলোর জীবনমানে উন্নতি ঘটানো সম্ভব।

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে এক প্রতিক্রিয়ায় তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠী পণ্যের দাম বাড়ার প্রতি অধিক সংবেদনশীল। তামাকপণ্যের দাম বাড়লে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে তামাকের ব্যবহার, তামাকজনিত মৃত্যু ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি অধিকহারে হ্রাস পায়। তাই তামাকে বর্ধিত করারোপ একটি দরিদ্র-বান্ধব পদক্ষেপ।

জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্সের সদস্য এবং বারডেম হাসপাতালের ডিপার্টমেন্ট অব ডেন্টাল সার্জারি বিভাগে উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যে ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ অর্জন করতে হলে সিগারেটসহ সব তামাকপণ্যের দাম সুনির্দিষ্ট করারোপের মাধ্যমে বাড়িয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে এখনই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে ও একইসঙ্গে সচেতনতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় দেড় লাখ মৃত্যু ও তিন লাখ ৮২ হাজার জনকে পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচানো যাবে।

এই দিবসে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর দাবি, বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বিলুপ্তসহ সব পাবলিক প্লেস, কর্মক্ষেত্র ও পাবলিক পরিবহনে শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা। তামাক কোম্পানির ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি’ বা সিএসআর কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। বিড়ি-সিগারেটের খুচরা শলাকা এবং প্যাকেটবিহীন জর্দা-গুল বিক্রি নিষিদ্ধ করা। ই-সিগারেট এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টসসের (এইচটিপি) মতো ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্টসমূহ আমদানি ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করা এবং সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার বৃদ্ধিসহ তামাকপণ্য মোড়কজাতকরণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ প্রভৃতি আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এদিকে সোমবার (৩১ মে) বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘Commit To Quit’ অর্থাৎ ‘আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি, জীবন বাঁচাতে তামাক ছাড়ি’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে বাংলাদেশ এবারের দিবসটি পালন করছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুক আমরা